Featuredদেশে দেশে হিন্দুধর্ম

জাপানে হিন্দু ধর্ম

ধন, সম্পত্তির দেবী মাতা লক্ষ্মীর নামে জাপানে এক শহর রয়েছে যার নাম কিচিওজি (Kichijoji)। জাপানী ভাষায় কিচিওজি এর অর্থ মাতা লক্ষ্মী বা লক্ষ্মীর মন্দির।

জাপান পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্র। হিন্দুরা জাপানে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। খুব সামান্য সংখ্যক হিন্দু জাপানে বসবাস করে, যাদের বেশীরভাগই ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আগত। জাপানের স্থানীয়রা সরাসরি হিন্দু ধর্ম অনুসরণ না করলেও তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে হিন্দু ধর্মের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

জাপানের উপর হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব এতটাই যে জাপানের রাজধানী টোকিওর কাছে এক শহরের নাম রাখা হয়েছে হিন্দু দেবীর নামে। ধন, সম্পত্তির দেবী মাতা লক্ষ্মীর নামে জাপানে এক শহর রয়েছে যার নাম কিচিওজি (Kichijoji)। জাপানী ভাষায় কিচিওজি এর অর্থ মাতা লক্ষ্মী বা লক্ষ্মীর মন্দির।

জাপানে দেবী লক্ষ্মী
ধন, সম্পত্তির দেবী মাতা লক্ষ্মীর নামে জাপানে এক শহর রয়েছে যার নাম কিচিওজি (Kichijoji)। জাপানী ভাষায় কিচিওজি এর অর্থ মাতা লক্ষ্মী বা লক্ষ্মীর মন্দির।

আরো পড়ুনঃ যুক্তরাজ্যে হিন্দুধর্ম

জাপানের বিখ্যাত কূটনীতিবিদ তাকাযুকি কিতাগওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “অনেকে মনে করে ভারত ও জাপানের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু আমি বলতে চাই যে এটা ভুল তথ্য। জাপানে হিন্দু সভ্যতার প্রভাব দারুনভাবে বিরাজমান।”

তিনি আরো বলেছিলেন, “জাপানে অনেক দেবদেবীর পূজা করা হয় যাদের নাম জাপানি ভাষা অনুযায়ী আলাদা কিন্তু মূলত সব দেবদেবী হিন্দু ধর্মের। জাপানে হাজার হাজার বছর ধরে হিন্দু সভ্যতার প্রভাব রয়েছে যা অস্বীকার করা যায় না।”

হিন্দু ধর্ম থেকেই বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি বিধায়, হিন্দু ধর্মের অনেক রীতিনীতি বৌদ্ধ ধর্মে আত্মীভূত হয়েছে। জাপানে যখন বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে, তখন চীন ও কোরিয়ার মাধ্যমে জাপানেও বৌদ্ধ বিশ্বাসগুলো ছড়িয়ে পড়ে। জাপানে সাতজন দেবতাকে ভাগ্য দেবতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে চারজন দেবতাই হিন্দু ধর্মের দেব-দেবী। তাঁরা হলেন হিন্দু দেবী সরস্বতীর রূপ বেনজাইতেন, কুবেরের রূপ বিশামন, শিবের রূপ ডাইকোকুতেন এবং লক্ষ্মীর রূপ কিচিজুতেন। এছাড়া শিব তথা ডাইকোকুতেনের নারীরূপ হিসেবে মা কালী দেবী ডাইকোকুতেন্ন নামে পূজিত হন।

আরো পড়ুনঃ ২০২৩ সালের দুর্গা পূজার সময়সূচি

খ্রিষ্টীয় ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শতাব্দীতে “সূত্র অব গোল্ডেন লাইট” এর চীনা অনুবাদের মাধ্যমে জাপানে বেনজাইতেন তথা দেবী সরস্বতীর আগমণ ঘটে। এই গ্রন্থের একটি সেকশন বেঞ্জাইতেনকে উৎসর্গ করা হয়েছে। লোটাস সূত্র নামক মহাযান বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থেও সরস্বতীর উল্লেখ রয়েছে।

জাপানে দেবী সরস্বতী
বহু বছর ধরে জাপান, মা সরস্বতী ‘বেঞ্জাইতেন‘-এর পুজো করে আসছে , বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করে।

বহু বছর ধরে জাপান, মা সরস্বতী ‘বেঞ্জাইতেন‘-এর পুজো করে আসছে , বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করে। এমনকি, হোমযজ্ঞ পর্যন্ত করা হয় মা সরস্বতীর পুজায়। জাপানি ভাষায় হোম -কে বলে হাভান বা গোমা ৷ সরস্বতীর হাতে যেমন বীণা থাকে, তেমনি দেবী বেঞ্জাইতেনের হাতেও বিওয়া নামের একটি ঐতিহ্যবাহী জাপানি বাদ্যযন্ত্র দেখতে পাওয়া যায়।

মা সরস্বতী ভারতবর্ষে বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী হিসেবে পূজিত হন। কিন্তু জাপানে তিনি জল, সময়, শব্দ, বাক্য, বাগ্মিতা, সৌন্দর্য্য, সঙ্গীত এবং জ্ঞানের দেবী। তবে আজ জাপানিরা দেবী সরস্বতীকে জনসাধারণ ও রাষ্ট্রের রক্ষয়িত্রী দেবী হিসেবে পুজো করে থাকেন।

আরো পড়ুনঃ দক্ষিণ কোরিয়ায় হিন্দু ধর্ম

এছাড়া হিন্দু দেবতা যম বৌদ্ধ রূপে জাপানে এনমা নামে পরিচিত। ভগবান বিষ্ণুর বাহন গরুড় জাপানে কারুরা নামে পরিচিত। হিন্দু দেবতা গণেশ জাপানে কাঙ্গিতেন নামে পরিচিত। টোকিওর ফুটকাও তামাগাওয়া নামক স্থানে অবস্থিত একটি বৌদ্ধ মন্দিরে গৌতম বুদ্ধের চেয়ে গণেশকে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয় এবং প্রদর্শন করা হয়।

সাগামি উপসাগরের এনোশিমা দ্বীপ, বিওয়া হ্রদের চিকুবু দ্বীপ এবং সেতো অন্তর্দেশীয় সাগরের ইৎসুকুশিমা দ্বীপের মন্দিরগুলোসহ সমগ্র জাপানে একশোর বেশী মন্দিরে মা সরস্বতী পূজিত হন। পশ্চিম টোকিওর ইনোকাশিরা পার্কে ,টোকিওর সবচেয়ে পুরনো ও বিখ্যাত সরস্বতী মন্দিরটি আছে। ১০৪৭ খ্রিঃ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কোওকেই দেবী সরস্বতীর মন্দিরগুলি নিয়ে একটি ইতিহাসও রচনা করেন।

যেভাবে ভারতীয় দেবদেবীকে পরম শ্রদ্ধায় আপন করে নিয়েছে জাপান, ঠিক সেভাবেই প্রাচীন ভারতবর্ষের ধর্মীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি আকর গ্রন্থ গুলিকেও তারা পরম ভালোবাসায় বুকে টেনে নিয়েছে। এমন কোনও প্রাচীন পুঁথি বাদ নেই যা জাপানি ভাষায় অনুবাদ হয়নি। যেমন ঋগ্বেদ, পাণিনি, মনুসংহিতা, অর্থশাস্ত্র, গীতা, উপনিষদ, মহাভারত, রামায়ণ, ত্রিপিটক, জাতক, পুরাণ, ইতিহাস, দর্শন, জ্যোতিষ, ভাষা, কলাবিদ্যা, নাট্যশাস্ত্র, থেকে কামশাস্ত্র। বিনয় বহেলের গবেষণা থেকে জানা যায়, ষষ্ঠ শতকের ভারতীয় সিদ্ধাম স্ক্রিপ্ট জাপানে সংরক্ষিত আছে। যা সম্ভবত ভারতেই নেই। এ ছাড়া দক্ষিণ ভারতের সুপ্রাচীন বিজাক্ষরা হরফ ভারতে নেই, কিন্ত জাপানে পাওয়া গিয়েছে।

আরো পড়ুনঃ ইসরায়েলে হিন্দু ধর্ম

জাপানের কোয়াসানে এখনও সংস্কৃত ভাষা শেখানো হয়। জাপানি হরফ ‘কেহ না ’তেও ষষ্ঠ শতকের দেবনাগরী হরফের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেছেন গবেষক বিনয় বহেল৷ হিন্দুদের যেমন অগ্নিদেব আছেন তাই হিন্দুরা অগ্নিপুজো করেন। তেমনি জাপানেওশ শিঙ্গন ও তেন্দাই বৌদ্ধরা আছেন, যাঁদের অগ্নিপুজোর সঙ্গে সুপ্রাচীন হিন্দুধর্মের রীতিনীতি ও অগ্নিপুজোর মিল আছে ৷ শিঙ্গনরা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের শাখা। জাপানে অন্তত ১ ,২০০ মন্দিরে তাঁরা বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করেই অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেন৷ সংস্কৃত তাই তাঁদের কাছে অতি পবিত্র ভাষা৷

বর্তমানে জাপানে ৪০ হাজারের মতো উপমহাদেশীয় অভিবাসী হিন্দু রয়েছেন। জাপানে বেশ কয়েকটি হিন্দু মন্দির রয়েছে। মন্দিরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, শিব শক্তি মন্দির ও আশ্রম টোকিও, শিরদি সাই বাবা টোকিও টেম্পল, ইসকন নিউ গয়া, বেনজাইটেনসামা মন্দির বা সরস্বতী মন্দির, গণেশ মন্দির, গোবিন্দ মন্দির টোকিও।

আরো পড়ুনঃ আরব দেশ কাতারে হিন্দু ধর্ম 

Leave a Reply

Back to top button
close
error: Content is protected !!